সরকারি উৎসব বন্ধ, বনমেলা বাতিল— অথচ হাতাই কতর ইকো পার্কে বনমন্ত্রীর জন্মদিনে উড়ল সরকারি টাকার ছড়াছড়ি; উঠছে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন।
তেলিয়ামুড়া প্রতিনিধি: ত্রিপুরা রাজ্যের বনদপ্তরের কোষাগারে নাকি চরম অর্থসঙ্কট— এই অজুহাত দেখিয়ে একের পর এক সরকারি উৎসব, বনমেলা ও বিভাগীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিগত কয়েক বছর ধরে। কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ— সকলেই সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রের আর্থিক বাস্তবতার কথা ভেবে।
কিন্তু সেই একই বনদপ্তরের মন্ত্রীর জন্মদিনে যে চিত্র সামনে এলো, তা দেখে হতবাক রাজ্যবাসী।
শনিবার বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খোয়াই জেলার হাতাই কতর (বড়মুড়া) ইকো পার্কে যে আয়োজন দেখা গেল, তা অনেকের চোখে কোনো সাধারণ জন্মদিন উদযাপন নয়— বরং যেন এক রাজকীয় উৎসব, বা রাজার রাজ্যাভিষেকের মহড়া।
বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন বনদপ্তরের বার্ষিক উৎসব, বনমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কার্যত বন্ধ। কারণ হিসেবে বারবার তুলে ধরা হয়েছে— “সরকারি কোষাগারে অর্থ নেই”।
কিন্তু সেই অর্থেরই যেন এক আশ্চর্য রূপান্তর ঘটল মন্ত্রীর জন্মদিনে।
জন্মদিন এলেই কি তবে কোষাগারের তালা খুলে যায়?
এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
ইকো পার্ক জুড়ে ছিল বিশালাকৃতির স্টেজ, ঝলমলে রঙিন আলোকসজ্জা, বাহারি সাজসজ্জা, উন্নত মানের খাবারের আয়োজন এবং বিনোদনের নানা ব্যবস্থা। পুরো এলাকাটি কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ ভি.আই.পি পার্টির চেহারা নিয়েছিল।
খোয়াই জেলা বনদপ্তরের শীর্ষ আধিকারিক থেকে শুরু করে দপ্তরের কর্মচারী, মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন ও পরিবারবর্গ— সকলেই ছিলেন উপস্থিত।
বনদপ্তরের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, এই গোটা আয়োজনেই খরচ হয়েছে সরকারি অর্থ।
অর্থাৎ, জনগণের করের টাকায় হয়েছে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত জন্মদিনের বিলাসী উদযাপন।
এই ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন মহলে।
যেখানে বনদপ্তরের কর্মচারীরা নিজেদের বিভাগীয় উৎসব বন্ধ থাকায় হতাশ, যেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের যুক্তি শুনে মেনে নিচ্ছেন অনুষ্ঠান বাতিল— সেখানে মন্ত্রীর জন্মদিনে এমন রাজকীয় আয়োজন অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর ও প্রশ্নবিদ্ধ।
অনেকে বলছেন,
“এটা যেন সরকারি টাকার আদ্যশ্রাদ্ধ করে ব্যক্তিগত উৎসবের মহোৎসব!”
সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলো এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে—
▪ সরকারি অর্থে ব্যক্তিগত জন্মদিন পালন কি আদৌ নৈতিক?
▪ বনদপ্তরের উৎসব বন্ধ রেখে মন্ত্রীর জন্মদিনে এত ব্যয় কতটা যুক্তিযুক্ত?
▪ এই আয়োজনের বাজেট এল কোথা থেকে?
▪ বনমন্ত্রী কি নিজে এই খরচ বহন করেছেন, নাকি দপ্তরের ফান্ড থেকেই খরচ হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পর্যন্ত সরকারি ভাবে পাওয়া যায়নি। বনদপ্তর কিংবা মন্ত্রীর পক্ষ থেকেও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলির দাবি যদি সত্যি হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে সরকারি অর্থের অপব্যবহারের একটি গুরুতর অভিযোগ।
ইতিমধ্যেই জনগণের একাংশ স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি তুলেছেন।
তাঁদের প্রশ্ন—
যদি বনদপ্তর সত্যিই অর্থসঙ্কটে থাকে, তবে এই বিলাসী জন্মদিন আয়োজন কিসের ইঙ্গিত দেয়?
এটা কি ক্ষমতার অপব্যবহার, নাকি প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা?
উত্তর খুঁজছে ত্রিপুরার মানুষ।
আর প্রশ্নটা একটাই—
“জনগণের টাকায় যদি মন্ত্রীদের জন্মদিন হয়, তবে সাধারণ মানুষের অধিকার কোথায়?”
