তেলিয়ামুড়া থেকে কলকাতা, আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত নেশা সিন্ডিকেট — প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে চলছে কোটি টাকার মাদক ও অর্থ পাচার ব্যবসা। সচেতন মহলের প্রশ্ন, “কে রক্ষা করছে দেবব্রত দে-কে?”
তেলিয়ামুড়া প্রতিনিধি, ১৩ নভেম্বর: ত্রিপুরার জিরানিয়া রেলস্টেশনে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ কফ সিরাপ ও মাদক সামগ্রী ফের উন্মোচন করল রাজ্যের মাদক চক্রের গভীর অন্ধকার দিক। এই কাণ্ডের তদন্তে ফের সামনে উঠে এসেছে কুখ্যাত পাচারকারী দেবব্রত দে-র নাম — যিনি বছরের পর বছর ধরে রাজ্যের মাদক সাম্রাজ্যের অঘোষিত “বেতাব বাদশা” হিসেবে পরিচিত। আগরতলার নাগেরজলা স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা এই ব্যক্তি প্রশাসনের নজরে বারবার এলেও, এখনো পর্যন্ত তিনি রয়ে গেছেন আইনের আওতার বাইরে।
উল্লেখযোগ্য, তেলিয়ামুড়ার তৎকালীন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক সোনাচরণ জমাতিয়া দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই দেবব্রত দে-র বিরুদ্ধে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মুঙ্গিয়াকামি এলাকায় গাঁজা সহ একাধিক নেশাজাত দ্রব্য উদ্ধার হওয়ার পর পুলিশের তদন্তে উঠে আসে দেবব্রতের নাম। পরে ক্রাইম ব্রাঞ্চের সহযোগিতায় SDPO জমাতিয়া অভিযান চালিয়ে দেবব্রতের কলকাতার নিউ টাউনে অবস্থিত বিলাসবহুল আবাস সিল করে দেন। সেই সময়ই প্রকাশ পায় তার প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের বিস্তার — যা শুধু ত্রিপুরা নয়, আসাম ও কলকাতার মাটিতেও গভীরভাবে প্রোথিত।
সূত্রের দাবি, বর্তমানে দেবব্রত দে আত্মগোপনে গৌহাটিতে বসবাস করছে। কলকাতার মাফিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে সে এখন স্থায়ীভাবে সেখানে না থাকলেও, গৌহাটি ও কলকাতার মধ্যে তার যাতায়াত অব্যাহত। অভিযোগ রয়েছে, এই পাচার সাম্রাজ্য থেকে অর্জিত কালো টাকা সাদা করার জন্য দেবব্রত দে নিজের ভাই সুমন দে-র নামে আগরতলায় খুলেছে “KTM Bike Showroom” এবং “Hero Bicycle Dealership”। জানা গেছে, এই দুই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দুইবার ED অভিযান চালিয়েছিল, যদিও তদন্তের অগ্রগতি তেমন হয়নি। ব্যবসার আড়ালে চলেছে কোটি টাকার অর্থপাচার ও মাদক বাণিজ্যের গোপন খেলা।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য — সিধাই-মোহনপুর এলাকার পাচারকারী চন্দন সরকারই রাজ্যে দেবব্রতের নেশা বাণিজ্য পরিচালনা করছে। চন্দন রাজ্য থেকে গাঁজা পাঠাচ্ছে বহিররাজ্যে, আর দেবব্রত ফিরিয়ে আনছে কফ সিরাপ, ইয়াবা ও অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য। এই দুই পাচারকারীর যোগসাজশেই তৈরি হয়েছে এক অন্ধকার সিন্ডিকেট, যার শিকড় আজ রাজ্যের প্রশাসনের গভীরে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে টানাপোড়েন। একসময় নেশা-কাণ্ডে নাম জড়ানোয় তেলিয়ামুড়ার এসডিপিও তাপস দে-কে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মুঙ্গিয়াকামি থানার ওসি সুরসেন ত্রিপুরা-কে সদর দপ্তরে ক্লোজ করা হয়েছিল। অথচ দেবব্রত দে-র বিরুদ্ধে আজও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি।
একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ক্রাইম ব্রাঞ্চের এক অফিসার সম্প্রতি কুখ্যাত পাচারকারী মান্তুনু সাহার কাছ থেকে দশ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছে, যদিও তার নাম জিরানিয়া রেল ওয়াগন কাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। বর্তমানে যাদের এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তারা আসলে কেবল ‘দাবার গুটি’, প্রকৃত মাষ্টারমাইন্ড নয়। ফলে রাজ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে — তবে কি দেবব্রত দে-কে প্রশাসনের ভেতরের কেউ রক্ষা করছে?
সচেতন মহলের তীব্র প্রশ্ন, “কেন বারবার দেবব্রত দে-র নামে তদন্ত থেমে যায়? কে বা কারা তাকে আড়াল করছে?” তরুণ সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, রাজ্যের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে পড়বে বলেই আশঙ্কা করছে বিশিষ্ট মহল।
আজ জিরানিয়া থেকে তেলিয়ামুড়া, আগরতলা থেকে গৌহাটি — সর্বত্র প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই প্রশ্ন:
“কবে ভাঙবে এই অন্ধকার সিন্ডিকেটের জাল?”
ত্রিপুরার নেশা-বাণিজ্যের ইতিহাসে জিরানিয়ার কফ সিরাপ কাণ্ড নিঃসন্দেহে এক নতুন অধ্যায়, কিন্তু সেই অধ্যায়ে ন্যায়ের আলো ফুটবে, না কি ফের প্রশাসনিক অন্ধকারেই চাপা পড়বে দেবব্রত দে-র নাম — সেটাই এখন রাজ্যবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
