উন্নয়নের স্লোগানের আড়ালে ভগ্ন যোগাযোগব্যবস্থা
কৃষক থেকে রোগী, পড়ুয়া থেকে যানচালক—সকলেই বিপন্ন; রাস্তা সংস্কারে প্রশাসনিক নীরবতায় চরম ক্ষোভ এলাকাবাসীর।
তেলিয়ামুড়া , ত্রিপুরা । হিরণময় রায়ঃ উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে যোগাযোগব্যবস্থা যে একটি এলাকার প্রাণরসায়ন—তা অস্বীকার করার কোনও অবকাশ নেই। উন্নত রাস্তা মানেই দ্রুত পরিষেবা, নিরাপদ যাতায়াত এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি। কিন্তু বাস্তব যখন এই তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে, তখন সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশ্ন প্রশাসনের দিকেই ধেয়ে আসে। তেমনই এক করুণ ও জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে তেলিয়ামুড়া থেকে উত্তর মহারানী সংযোগকারী সড়কপথ, যা গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যত সাধারণ মানুষের কাছে ‘প্রতিদিনের দুর্ভোগের পাঠশালা’তে পরিণত হয়েছে।
২৯-নং কৃষ্ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত গোলাবাড়ি, উত্তর কৃষ্ণপুর, দক্ষিণ কৃষ্ণপুর, মধ্য কৃষ্ণপুর ও নয়নপুর—এই বিস্তীর্ণ এলাকাগুলি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেই কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে গেলেই প্রথম ও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই ভগ্নপ্রায় রাস্তা। জায়গায় জায়গায় বড় বড় গর্ত, দেবে যাওয়া অংশ, আর বর্ষাকালে কাদায় পরিণত হওয়া সড়কপথে যান চলাচল কার্যত দুঃসাধ্য। ফলে কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছায় না, অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যায় ফসল। এতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বেড়ে যাচ্ছে পরিবহণ খরচ—যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের জীবিকায়।
যানচালকদের অভিযোগ আরও তীব্র। নয়নপুর এলাকার এক গাড়িচালক ক্ষোভের সঙ্গে জানান,
“নিজের বাড়ি ওই এলাকাতেই। কিন্তু রাস্তাটার অবস্থা এতটাই খারাপ যে যাত্রী নিয়ে ঢুকলে গাড়ি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। তাই অনেক সময় যেতে চাই না।”
এর ফল ভোগ করছেন সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ও নিত্যযাত্রীরা।
এই রাস্তার ভগ্নদশা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অসুস্থ মানুষ ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য। জরুরি অবস্থায় রোগীকে তেলিয়ামুড়া মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যেতে গিয়ে এই রাস্তা যেন মৃত্যুফাঁদের রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রাপথের কারণে বহু সময় রোগীর অবস্থা আরও সংকটজনক হয়ে পড়ছে।
৭০ বছরের এক প্রবীণ বাসিন্দা হতাশ কণ্ঠে বলেন,
“এই রাস্তায় পাঁচ মিনিট হাঁটলেই মাথা ঘুরে যায়। প্রতিদিন এমন কষ্ট সহ্য করতে করতে শরীরটাই ভেঙে পড়ছে।”
এদিকে এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্কও। এলাকাবাসীদের অভিযোগ, ২৯-নং কৃষ্ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা নিজে উত্তর মহারানীপুর এলাকায় বসবাস করলেও এই রাস্তার করুণ অবস্থার কোনও পরিবর্তন চোখে পড়েনি। এমনকি স্থানীয়দের কটাক্ষ,
“রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে মন্ত্রী মহাশয় নিজেই অন্য বিধানসভা কেন্দ্রের রাস্তা ব্যবহার করে বাড়ি আসেন!”
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দাবি জানানো সত্ত্বেও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভোটের সময় উন্নয়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আজ তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়—সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
এলাকাবাসীদের বক্তব্য স্পষ্ট ও কঠোর—
“প্রশাসন যদি এখনই আমাদের কথা না শোনে, তাহলে মানুষ রাস্তায় নামতে বাধ্য হবে। আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে।”
কৃষক, ছাত্রছাত্রী, রোগী ও যানচালক—সকলেরই একটাই দাবি,
“যত দ্রুত সম্ভব এই রাস্তাটি সংস্কারের কাজ শুরু হোক।”
এখন সমস্ত নজর সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনের দিকে। মানুষের চোখে একটাই প্রশ্ন—শীত যায়, গরম আসে; গরম যায়, শীত আসে—কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই রাস্তার হাল কেন আর ফেরে না? জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই যদি জনগণের মৌলিক সমস্যার সমাধানে নীরব থাকেন, তবে উন্নয়নের ভাষা আসলে কার জন্য লেখা হচ্ছে?
চলমান এই জনদুর্ভোগ কি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের ঘুম ভাঙাবে, নাকি এভাবেই বছরের পর বছর প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতি আর হতাশার চক্র ঘুরতেই থাকবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
