মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা সহ রাজ্য নেতৃত্বের উপস্থিতিতে বিশাল যোগদান সভা, রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য.
তেলিয়ামুড়া প্রতিনিধি: স্ব-শাসিত জেলা পরিষদ (ADC) নির্বাচনকে সামনে রেখে ত্রিপুরার রাজনীতিতে ক্রমেই বাড়ছে তৎপরতা। আর ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রবিবার বিকেলে বড়মুড়া (হাতাইকতর) পাহাড়ের পাদদেশে এক বিশাল যোগদান সভার মধ্য দিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
১৬-মান্দাই নগর বিধানসভা কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত এই সভা ঘিরে গোটা এলাকা ছিল উৎসবমুখর ও রাজনৈতিকভাবে উত্তাল।
এই যোগদান সভায় তিপ্রা মথা ও সিপিআইএম ছেড়ে মোট ১৮১টি পরিবার থেকে ৪৯৫ জন জনজাতি ভোটার বিজেপিতে যোগদান করেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এই দলবদলকে আসন্ন ADC নির্বাচনের আগে বিজেপির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ বা ‘মাস্টার স্ট্রোক’ বলেই মনে করছে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা, বিজেপি রাজ্য সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য, উপজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা, বিধানসভার মুখ্য সচেতক ও তেলিয়ামুড়ার বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়, কল্যাণপুর-প্রমোদনগরের বিধায়ক পিনাকী দাস চৌধুরী, জনজাতি যুবনেতা বিপীন দেববর্মা সহ বিজেপির একাধিক শীর্ষ নেতৃত্ব।
সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা বলেন, বিজেপি সরকার সব সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। উন্নয়ন, শান্তি ও সহাবস্থানের রাজনীতির মাধ্যমেই রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই বিজেপির মূল লক্ষ্য।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি ত্রিপুরার ২৫ বছরের বাম শাসনের সময়কার একাধিক সহিংস ও অমানবিক ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন শুকরাম দেববর্মা হত্যাকাণ্ড, ১৯৮২ সালে কৈলাশহরে কংগ্রেস কর্মী ভগবতি বসাক ও তাঁর পরিবারকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা, ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে পাপাই সাহার মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলি।
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র “ভারত মাতা কি জয়” স্লোগান দেওয়ার অপরাধে অলক দেব নামে এক বিজেপি কর্মীর উপর যে নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছিল, সেই ইতিহাস আজও রাজ্যের মানুষ ভুলে যায়নি। এমনকি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা পুষ্প কপালি নামের এক মহিলাকে সিপিআইএম পার্টি অফিসে ডেকে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কল্যাণপুর গণহত্যার কথাও, যা আজও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি রাজ্য সভাপতি রাজীব ভট্টাচার্য তাঁর ভাষণে তৎকালীন বাম অপশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বলেন, রাজ্যের মানুষ এখন উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে রায় দিচ্ছেন।
সবশেষে বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায়ের তীর্যক ও ঝাঁঝালো বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই বিশাল যোগদান সভার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে বিজেপির এই ধরনের গণযোগদান স্পষ্টভাবেই দলের সাংগঠনিক ভিত আরও মজবুত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে যে এলাকাগুলিকে এতদিন তিপ্রা মথা ও সিপিআইএম-এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে ধরা হত, সেখানে এই দলবদল রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের বার্তা বহন করছে।
সব মিলিয়ে, বড়মুড়ার এই যোগদান সভা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং আসন্ন স্ব-শাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জনজাতি ভোটব্যাংকের দখল নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই যোগদানের প্রভাব আগামী দিনে নির্বাচনী ফলাফলে কতটা পড়ে, সেদিকেই এখন নজর ত্রিপুরাবাসীর।
