ভুল নিমন্ত্রণপত্র, অব্যবস্থা, দোকানদারদের সঙ্গে সংঘাত—উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে গেল অনিয়মের অভিযোগ।
তেলিয়ামুড়া প্রতিনিধি: তেলিয়ামুড়া মহকুমার চাকমাঘাটে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী পৌষ সংক্রান্তি মেলা এবছর যেন উৎসবের আনন্দ নয়, বরং বিতর্ক ও ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মেলার সূচনালগ্ন থেকেই একের পর এক অব্যবস্থা, অবহেলা এবং আয়োজকদের অদূরদর্শিতার ছবি সামনে আসায় চরম অসন্তোষে ফেটে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, দর্শনার্থী ও ব্যবসায়ীরা।
প্রথম থেকেই চোখে পড়ে মেলার আয়োজনে চরম গাফিলতি। মেলার ফ্লেক্স ও নিমন্ত্রণপত্রে একাধিক বানান ও তথ্যগত ভুল নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—তেলিয়ামুড়ার বিধায়িকা কল্যাণী সাহা রায় এবং কল্যাণপুরের বিধায়ক পিনাকী দাস চৌধুরীর নাম নিমন্ত্রণপত্রে না থাকা। এই বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। মেলায় আগত বহু দোকানদার অভিযোগ করেন, মেলা কমিটি ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের দোকান খুলতে বাধা দেওয়া হয়। এর ফলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বহু ব্যবসায়ী। এক ক্ষুব্ধ দোকানদার স্পষ্ট ভাষায় বলেন—
“আমি আগামী বছর থেকে আর এই মেলায় আসব না। গত ২০ বছর ধরে এই মেলায় ব্যবসা করছি। পিনাকী দাস চৌধুরীর এলাকায় যদি এই মেলা হত, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এমন অবস্থা হতে দিতেন না। তিনি গরীবের পেটে ভাত দিতে জানেন, পেটে লাথি মারতে জানেন না।”
মেলার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছবিও ছিল হতাশাজনক। অনুষ্ঠানের মঞ্চের সামনে দীর্ঘক্ষণ ফাঁকা চেয়ার পড়ে থাকতে দেখা যায়। জানা গেছে, উদ্বোধক সহ মোট ২১ জন অতিথির জন্য চেয়ার রাখা হলেও দর্শক সংখ্যা ছিল আনুমানিক মাত্র ৪০ জন। যা মেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও মানবিক দিক থেকে লজ্জাজনক চিত্র দেখা যায় পুরোহিত ও নাপিতদের ক্ষেত্রে। তাঁদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট বসার জায়গা বা ছাউনি না থাকায় খোলা আকাশের নিচেই নিজেদের কাজ পরিচালনা করতে বাধ্য হন তাঁরা। পৌষ সংক্রান্তির মতো একটি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এই ধরনের অব্যবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।
এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—
মেলার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ গেল কোথায়?
এত অনিয়ম ও অব্যবস্থার দায় কে নেবে?
এদিকে মেলার উদ্বোধক তথা রাজ্যের জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা সাংবাদিকদের জানান, আগামী বছর থেকে চাকমাঘাটের পৌষ সংক্রান্তি মেলা দুই দিনব্যাপী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে আরও বৃহৎ পরিসরে এবং সুন্দরভাবে আয়োজন করা যায়।
তবে স্থানীয়দের একাংশের স্পষ্ট মত—শুধু দিন বাড়ালেই মেলার মান উন্নত হবে না। আয়োজনে স্বচ্ছতা, দায়িত্ববোধ ও পরিকল্পনার অভাব থাকলে ভবিষ্যতে এই মেলা আরও বিশৃঙ্খলার দিকেই যাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, উৎসবের নামে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে তা শুধু উৎসবের আনন্দকেই ম্লান করে না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসে বড়সড় ধাক্কা দেয়।
চাকমাঘাটের পৌষ সংক্রান্তি মেলা এবছর যেন আনন্দের উৎসব নয়, বরং প্রশ্ন আর বিতর্কের মেলাতেই পরিণত হলো।
